আপনি কি বস্তায় আদা চাষ করতে চান, কিন্তু সঠিক গাইড পাচ্ছেন না? বস্তায় আদা চাষের সঠিক নিয়ম জানেন না কিংবা কিভাবে আদা চাষে বস্তা তৈরী করবেন বা কিভাবে কোন কোন সার দিবেন এই নিয়ে চিন্তায় আছেন বা জানতে চান?
আর কোনো চিন্তা নেই, আজকে আপনি এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে বস্তায় আদা চাষের A to Z বিস্তারিত জানতে পারবেন। আপনি জানতে পারবেন যে, কিভাবে মাটি তৈরী করতে হবে, কিভাবে কতটুক পরিমান সার প্রয়োগ করতে হবে, কোন সমস্যা বীজ বপন করতে হবে ইত্যাদি বিষয় একদম বিস্তারিত। তাহলে চলুন দেরি না করে শুরু করা যাক।
বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি
বর্তমানে অল্প জায়গায় অধিক আদার ফলন পাওয়া যায় বস্তায় আদা চাষ করে। এই জন্য অনেক কৃষক কিংবা কিশোর-কিশোরীরা বস্তায় আদা চাষ করার প্রতি অনেক আগ্রহ প্রকাশ করে। এই পদ্ধতিতে আদার যেমন অধিক ফলন হয়, তেমনি খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন পরে না। তাহলে চলুন আদা চাষের ফুল প্রসেসটা জেনে নেই।
বস্তায় আদা চাষের মাটি তৈরি
সিমেন্ট বা অন্য বস্তায় আদা চাষের জন্য নিম্নলিখিত উপাদানগুলো একত্রে মিশ্রণ করে আদা রোপণের ১৫-২০ দিন পূর্বে একত্রে পালা/ ঢিবি করে পলিথিন দ্বারা ঢেকে রাখতে হবে যাতে বাতাস প্রবেশ না করে। প্রতি বস্তায় উল্লেখিত পরিমাণে মাটি, জৈবসার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।
আদার ভাল ফলন পেতে হলে জমির উর্বরতার উপর নির্ভর করে প্রতি বস্তায় প্রথমে মাটি ১০-১২ কেজি, গোবর ৫ কেজি, ভার্মি কম্পোস্ট ২ কেজি, টিএসপি ২০ গ্রাম, এমওপি ৭.৫ গ্রাম, ছাই ১ কেজি, কার্বোফুরান/ কার্বারিল ১০ গ্রাম, দস্তা বা জিংক ৫ গ্রাম এবং বোরন ৫ গ্রাম মিশিয়ে নিতে হবে।
মিশ্রণ তৈরির সময় মাটি, গোবর, ভার্মি কম্পোস্ট, ছাই, টিএসপি, কার্বোফুরান, জিংক, বোরন সব একত্রে মিশিয়ে দিতে হবে। অর্ধেক এমওপি মিশ্রণ তৈরির সময় দিতে হবে। অর্ধেক ইউরিয়া, অর্ধেক টিএসপি আদা রোপণের ৫০ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক ইউরিয়া এমওপি সমানভাবে দুই কিস্তিতে রোপণের যথাক্রমে ৮০ দিন ও ১১০ দিন পর বস্তায় প্রয়োগ করতে হবে। অর্ধেক টিএসপি সার আদা রোপণের ৬৫ দিন পর বাকি অর্ধেক টিএসপি সার আদা রোপণের ১৩০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।
আরও পড়ুনঃ আঙ্গুর চাষ পদ্ধতি – আঙ্গুরের জাত, চারা তৈরি, গাছের পরিচর্যা, গাছের দাম বিস্তারিত
আদা চাষের উপযুক্ত সময়
এপ্রিল-মে (চৈত্র বৈশাখ) মাসে আদা লাগাতে হবে। তবে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ আদা লাগানোর উপযুক্ত সময়।
বস্তায় মিশ্রণ ভরাট করাঃ বস্তায় আদা লাগানোর পূর্বে প্রতি বস্তায় পূর্বে প্রস্তুতকৃত মিশ্রণ এমনভাবে ভরাতে হবে যাতে বস্তার উপরের দিকে ১-২ ইঞ্চি ফাঁকা থাকে।
বস্তা সাজানো/ স্থাপন পদ্ধতি
৩ মিটার চওড়া ও প্রয়োজনমত লম্বা বেড তৈরি করতে হবে। একটি বেড থেকে অন্য বেডের মাঝখানে ৩০ সেমি: ফাঁক রাখতে হবে। ড্রেনের মাটি বেডের উপর দিয়ে বেডকে উঁচু করে নিতে হবে যাতে বেডে বৃষ্টির পানি জমাট বেঁধে না থাকে। এর পর প্রতি বেডে ২ টি সারি এমন ভাবে করতে হবে যেন এক সারি থেকে অন্য সারির মাঝে ১ মিটার দূরত্ব বজায় থাকে। প্রতি সারিতে ৬-৮ ইঞ্চি পর পর পাশাপাশী ২ টি বস্তা স্থাপন করতে হবে।
বস্তায় বীজ বপন পদ্ধতি
প্রতি বস্তায় ৪০-৫০ গ্রামের একটি বীজ মাটির ভিতরে ৪-৫ ইঞ্চি গভীরে লাগাতে হবে। বীজ লাগানোর পর মাটি দ্বারা ঢেকে দিতে হবে।
বীজ শোধনঃ বস্তায় আদা রোপণের পূর্বে ২ গ্রাম ভিটাভ্যাক্স/ প্রোভেক্স ২ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে এক কেজি আদা বীজ এক ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর ভেজা আদা পানি থেকে উঠিয়ে ছায়ায় রেখে শুকিয়ে বস্তায় রোপণ করতে হবে।
বস্তায় আদা চাষে সার প্রয়োগের নিয়ম
নিচে সার প্রয়োগের একটি চার্ট আপনাকে দেয়া হলো, আপনি এই নিয়ম মেনে সার প্রয়োগ করলে অবশ্যই ভালো ফলন হবে। নিচের চার্টটি দেখে নিন।

আন্তঃপরিচর্যা
বস্তায় আদা চাষ করলে আগাছা তেমন হয় না। যদি আগাছা প্রথমে দেখা যায় হবে নিড়ানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া পরবর্তীতে সার প্রয়োগের সময় মাটি আলগা করে গাছের গোড়া থেকে দূরে সার প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
ফসল সংগ্রহ
সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বস্তা থেকে আদা উঠানো হয়। আদা পরিপক্কতা লাভ করলে গাছের পাতা ক্রমশ হলুদ হয়ে কান্ড শুকাতে শুরু করে। এ সময় আদা তুলে মাটি ঝেড়ে ও শিকড় পরিষ্কার করে সংরক্ষণ করা হয়।
ফলনঃ সাধারণত প্রতি বস্তায় জাত ভেদে ১-৩ কেজি পর্যন্ত আদার ফলন পাওয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ পাইওনিয়ার ভুট্টা ৩৩৫৫ চাষ পদ্ধতি সম্পূর্ণ গাইড
শেষ কথা
আমি আশা করি যে আপনি আদা চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। যদি আপনার এরপর কোনো প্রশ্ন থাকে কিংবা জানতে চান , তাহলে কমেন্ট করে জানান কিংবা আমাদের মেইল করুন। আমরা চেষ্টা করবো আপনাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার জন্য। আর মনোযোগ সহকারে পুরো বিষয় পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
FAQ
১. বস্তায় আদা চাষে মাটি প্রস্তুতের সময় কোন কোন সার দিতে হয়?
উত্তর: রোপণের ১৫–২০ দিন আগে প্রতি বস্তায় গোবর ৫ কেজি, ভার্মি কম্পোস্ট ২ কেজি, টিএসপি ২০ গ্রাম, এমওপি ৭.৫ গ্রাম (অর্ধেক), ছাই ১ কেজি, কার্বোফুরান/কার্বারিল ১০ গ্রাম, জিংক ৫ গ্রাম এবং বোরন ৫ গ্রাম একত্রে মিশিয়ে দিতে হয়।
২. ইউরিয়া সার কখন এবং কতবার প্রয়োগ করতে হয়?
উত্তর: ইউরিয়া সার তিন ধাপে প্রয়োগ করতে হয়। রোপণের ৫০ দিন পর অর্ধেক, এরপর ৮০ দিন ও ১১০ দিন পর অবশিষ্ট অংশ দুই কিস্তিতে দিতে হয়।
৩. টিএসপি সার কতবার প্রয়োগ করা হয়?
উত্তর: টিএসপি সার মোট তিনবার প্রয়োগ করা হয়। প্রথমে মাটি তৈরির সময়, এরপর রোপণের ৫০ দিন পর অর্ধেক, ৬৫ দিন পর অবশিষ্ট অর্ধেক এবং ১৩০ দিন পর প্রয়োগ করতে হয়।
৪. এমওপি সার কীভাবে ভাগ করে দিতে হয়?
উত্তর: এমওপি সারের অর্ধেক মাটি প্রস্তুতের সময় দিতে হয়। বাকি অর্ধেক ৮০ দিন ও ১১০ দিন পর দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হয়।
৫. সার প্রয়োগের সময় কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?
উত্তর: সার প্রয়োগের সময় মাটি আলগা করে গাছের গোড়া থেকে কিছুটা দূরে সার দিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সরাসরি গাছের গোড়ায় সার দেওয়া উচিত নয়।
I am Moshiur Rahman, an enthusiastic writer on agricultural information and research. I strive to deliver reliable and easy-to-understand information on modern agricultural technology, crop production, agricultural loans, and agricultural development, so that farmers and all those involved in agriculture can benefit.