আপনি কি লাউ চাষ করেছেন কিংবা লাউ চাষ করতে চাচ্ছেন, কিন্তু লাউ গাছে সার প্রয়োগ সম্পর্কে সঠিক নিয়ম জানেন না? তাহলে আজকের এই আর্টিকেল হবে আপনার জন্য। এই আর্টিকেল এর মধ্যে আপনি জানতে পারবেন লাউ গাছে সার প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে একদম বিস্তারিত।
লাউ গাছে সার প্রয়োগ পদ্ধতি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাউ গাছে সার প্রয়োগ কতটুটুকু করতে হবে , কোন সার কতটুক পরিমান দিতে হবে এবং কোন সময় দিতে হবে, আর বিশেষ করে লাউ গাছে সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন কোন ভুলগুলো করা যাবে না ইত্যাদি একদম বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তাহলে চলুন শুরু করা যাক লাউ গাছে সার প্রয়োগ পদ্ধতি ।
লাউ চাষের জন্য মাদা বা গর্ত প্রস্তুতির নিয়ম
লাউ সাধারণত মাদা বা গর্তে চাষ করা হয়। সরকারি কৃষি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি মাদা প্রায় ৪–৫ মিটার দূরত্বে করা ভালো। গর্তের প্রস্থ প্রায় ৭৫ সেমি এবং গভীরতা ৬০ সেমি হলে শিকড় ভালোভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে।
মাদা তৈরির সময়ই গোবর ও নির্ধারিত রাসায়নিক সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুরুতেই যদি জৈব সার, ফসফরাস ও পটাশ সঠিকভাবে মিশে যায়, তাহলে গাছের শিকড় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছ মজবুত হয়। পরবর্তীতে ফলনেও এর প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়।

বেসাল সার প্রয়োগ পদ্ধতি
কৃষি-তথ্যভিত্তিক নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি শতকে লাউ চাষে সার প্রয়োগ সাধারণত নিম্নোক্তভাবে করা হয়ঃ-
- গোবর/কম্পোস্ট: ৪০ কেজি
- ইউরিয়া: ২ কেজি
- টিএসপি: ১.৬ কেজি
- এমপি (MOP): ১.২ কেজি
- বোরন: ১০ গ্রাম
তবে এগুলো একসাথে দিয়ে দিলেই কাজ শেষ নয়। মাদা তৈরির সময় পুরো গোবর, পুরো টিএসপি, পুরো বোরন, এমপির অর্ধেক এবং মোট ইউরিয়ার পাঁচ ভাগের এক ভাগ মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়।
এরপর ১০–১৫ দিন অপেক্ষা করা উচিত। এই সময়ের মধ্যে সার মাটির সাথে বিক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং মাটির অবস্থা বপন বা চারা রোপণের উপযোগী হয়।
লাউ গাছে টপ ড্রেসিং পদ্ধতি
প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর বাকি ইউরিয়া ও এমপি একবারে না দিয়ে চার কিস্তিতে দিতে হয়। অর্থাৎ পুরো জীবনচক্রে মোট চারবার ভাগ করে প্রয়োগ করতে হবে।
আরো পড়ুনঃ ধানের মাজরা পোকা দমন :ক্ষতির লক্ষণ,দমনের উপায়,কীটনাশক এর দাম
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার, সার কখনোই গাছের একেবারে গোড়ায় লাগিয়ে দেওয়া উচিত নয়। গোড়া থেকে কিছুটা দূরে বৃত্তাকারে (রিং পদ্ধতিতে) ছিটিয়ে হালকা কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর সেচ দিলে সার দ্রুত গলে শিকড়ে পৌঁছায় এবং অপচয়ও কম হয়।

ভাগে ভাগে সার দেওয়ার ফলে নাইট্রোজেনের কার্যকারিতা বাড়ে এবং গাছ অতিরিক্ত পাতায় না গিয়ে সুষমভাবে ফুল ও ফল ধরে।
প্রতি শতক ও প্রতি মাদায় সারের সঠিক পরিমাণ
অনেক কৃষক শতক বা বিঘা ধরে হিসাব না করে প্রতি মাদা অনুযায়ী সার দেন। মাঠপর্যায়ের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো—
- প্রতি মাদায় গোবর প্রায় ২০ কেজি
- টিএসপি ২০০ গ্রাম
- এমপি ৭৫ গ্রাম
ছোট পরিসরে চাষ করলে এই পদ্ধতিতে হিসাব রাখা সহজ হয়। তবে জমির উর্বরতা, মাদার সংখ্যা ও মাটির ধরন ভেদে মোট ডোজ পরিবর্তিত হতে পারে। বড় পরিসরে বা বাণিজ্যিক চাষে শতকভিত্তিক মানসম্মত ডোজ অনুসরণ করাই বেশি নিরাপদ।
ভালো ফলনের জন্য ৬টি জরুরি সতর্কতা
- পচা গোবর ব্যবহার করুন। কাঁচা গোবর শিকড়ে ক্ষতি করতে পারে এবং রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
- ইউরিয়া একসাথে দেবেন না। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন পাতার বৃদ্ধি বাড়ায়, কিন্তু ফুল ও ফল কমিয়ে দিতে পারে।
- বোরন মাত্রা মেনে দিন। এটি ফুল ও ফল সেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে বেশি দিলে ক্ষতি হতে পারে।
- সার দেওয়ার পর হালকা সেচ দিন। শুষ্ক মাটিতে সার দিলে গাছ পুড়ে যেতে পারে।
- পাতা হলদে দেখলেই বাড়তি সার দেবেন না। আগে যাচাই করুন নির্ধারিত কিস্তিগুলো ঠিকমতো দেওয়া হয়েছে কি না।
- সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষা করুন। দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ও নিরাপদ চাষের জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এই বিষয়গুলো মানলে সার প্রয়োগ কার্যকর হয় এবং খরচের অপচয় কমে।
সার দেওয়ার সময় কৃষকের করণীয় বিষয়সমূহ
লাউ গাছে সার প্রয়োগের দিন কয়েকটি বিষয় দেখে নিন—
- মাটি কি হালকা ভেজা আছে? না থাকলে আগে সেচ দিন।
- আগাছা পরিষ্কার করা হয়েছে?
- সার কি গাছের গোড়ায় লেগে যাচ্ছে?
- ছিটানোর পর মাটির সাথে হালকা মিশিয়েছেন?
- শেষে সেচ দিয়েছেন?
এভাবে নিয়ম মেনে কাজ করলে ফলন স্থিতিশীল থাকে এবং গাছ সুস্থ থাকে।
উপসংহার
আমি আশা করি যে আপনি লাউ গাছে সার প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন । জদিও আপনার এই বিসয়ে আরও কিছু জানার থাকে, তাহলে আমাকে জানতে পারেন কিংবা কমেন্ট করতে পারেন । আমি চেষ্টা করব আপনাকে সহযোগিতা করার জন্য।
সবকিছু মিলিয়ে লাউয়ের সার ব্যবস্থাপনায় মূল বিষয় তিনটি—
- প্রথমত, জৈব সার ও বেসাল ডোজ ঠিকভাবে মাদায় মেশানো।
- দ্বিতীয়ত, ইউরিয়া ও এমপি ভাগ করে নির্ধারিত কিস্তিতে দেওয়া।
- তৃতীয়ত, মাটির অবস্থা বুঝে প্রয়োগ করা।
আরো পড়ুনঃ বিকাশ একাউন্ট বন্ধ করার নিয়ম ২০২৬
মানসম্মত ডোজ ও বিভাজিত প্রয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাঠপর্যায়ে বাস্তব ও টেকসই ফল পাওয়া যায়। সঠিক সময়ে সঠিক সার—এই নীতিটাই লাউ চাষে সফলতার মূল চাবিকাঠি।
FAQ
১. লাউ গাছে সার প্রয়োগ কখন শুরু করতে হয়?
উত্তরঃ মাদা/গর্ত তৈরির সময় বেসাল সার (গোবর, টিএসপি, বোরন, এমপির অর্ধেক ও ইউরিয়ার একাংশ) মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। এরপর ১০–১৫ দিন পর বীজ বা চারা রোপণ করা উত্তম।
২. লাউ গাছে ইউরিয়া কতবার দিতে হয়?
উত্তরঃ মোট ইউরিয়ার এক-পঞ্চমাংশ বেসাল হিসেবে দিতে হয় এবং বাকি অংশ সমানভাবে ৪ কিস্তিতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন পর্যায়ে প্রয়োগ করতে হয়।
৩. ১ বিঘা জমিতে লাউ চাষে কত সার লাগে?
উত্তরঃ প্রায় ১৩২০ কেজি গোবর, ৬৬ কেজি ইউরিয়া, ৫২.৮ কেজি টিএসপি, ৩৯.৬ কেজি এমপি এবং ৩৩০ গ্রাম বোরন প্রয়োজন (প্রতি শতক ডোজ × ৩৩ শতক হিসেবে হিসাব)।
৪. লাউ গাছে সার দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?
উত্তরঃ সার সরাসরি গাছের গোড়ায় না দিয়ে একটু দূরে গোল করে ছিটিয়ে হালকা কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়, তারপর সেচ দিতে হয়।
৫. লাউ গাছে অতিরিক্ত সার দিলে কী ক্ষতি হয়?
উত্তরঃ অতিরিক্ত ইউরিয়া দিলে গাছ বেশি লতা ও পাতা বাড়ায় কিন্তু ফলন কমে যেতে পারে। তাই নির্ধারিত ডোজ অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
I am Moshiur Rahman, an enthusiastic writer on agricultural information and research. I strive to deliver reliable and easy-to-understand information on modern agricultural technology, crop production, agricultural loans, and agricultural development, so that farmers and all those involved in agriculture can benefit.



