লিচু চাষ পদ্ধতি-সার প্রয়োগ,পানি দেওয়ার নিয়ম ইত্যাদি বিস্তারিত

লিচু চাষ পদ্ধতি এখন অনেক কৃষকেই চাষ করে থাকেন। অনেকে তাদের জমি অনাবাদি না রেখেই লিচুর চারা লাগিয়ে থাকেন, এরপর সঠিক নিয়মে সার প্রয়োগ , সেচ,ইত্যাদি দিয়ে তার লিচুর বাগানকে করে রাখে সুন্দর ও অধিক লিচু ফলনের উপযোগী। আপনিও যদি ভাবেন লিচু চাষ করবেন তাহলে অবশ্যই এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

চলুন আমারা লিচু চাষ সম্পর্কে জেনে নিই, কিভাবে আপনি জমি প্রস্তুত করবেন, এরপর জমিতে সার প্রয়োগ করবেন, কতটুক প্রয়োগ করবেন , এইরকম নানান বিষয় নিয়ে একদম বিস্তারিত আলোচনা করবো। আপনি এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে সবকিছু ধাপে ধাপে বিস্তারিত জানতে পারবেন।

লিচু চাষ পদ্ধতি

লিচু চাষ পদ্ধতি

১. সঠিক জমি ও মাটি নির্বাচন

লিচু চাষের জন্য জমি নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এমন জমি নির্বাচন করা উচিত যেখানে সূর্যের আলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পড়ে এবং বৃষ্টির পানি সহজে নিষ্কাশিত হতে পারে। জলাবদ্ধতা লিচু গাছের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

  • জমির ধরণ: উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি লিচু চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। নিচু জমিতে পানি জমার প্রবণতা বেশি থাকে, যা শিকড় পচে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
  • মাটির ধরণ: লিচু চাষের জন্য দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। এই ধরণের মাটিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো থাকে এবং গাছের শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করতে পারে। এঁটেল মাটি যেখানে পানি জমে থাকে, তা লিচু চাষের জন্য উপযোগী নয়।
  • মাটির pH: মাটির pH ৫.৫ থেকে ৭.০ এর মধ্যে হলে লিচু গাছের বৃদ্ধি ও ফলন সবচেয়ে ভালো হয়। মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্ব পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা যেতে পারে। অম্লীয় মাটি হলে চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে এবং ক্ষারীয় মাটি হলে জিপসাম প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

২. উন্নত জাত নির্বাচন

লিচু চাষে ভালো ফলনের জন্য উন্নত জাতের চারা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে চাষের জন্য বেশ কিছু উন্নত জাত রয়েছে, তবে ‘চায়না-৩’ লিচু (চায়না ৩ লিচু চাষ পদ্ধতি) তার উচ্চ ফলন এবং চমৎকার স্বাদের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়াও আরও কিছু জনপ্রিয় জাত রয়েছে।

  • চায়না-৩ (China-3): এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং উচ্চ ফলনশীল জাতগুলির মধ্যে অন্যতম।
    • চায়না ৩ লিচু গাছ চেনার উপায় : এই জাতের গাছের পাতা গাঢ় সবুজ এবং অপেক্ষাকৃত বড় হয়। নতুন কুশি বা পাতার অগ্রভাগ হালকা তামাটে রঙের হয়। ফল আকারে বড়, গোলাকার বা সামান্য ডিম্বাকার, উজ্জ্বল লাল রঙের এবং শাঁস পুরু ও রসালো হয়। এর বীচি ছোট হয়, যা একে বাণিজ্যিকভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ফলের মিষ্টতাও তুলনামূলকভাবে বেশি।
    • চায়না ৩ লিচু চারার দাম: চারার গুণগত মান, বয়স এবং নার্সারির উপর ভিত্তি করে চায়না ৩ লিচু চারার দাম পরিবর্তিত হয়। সাধারণত, একটি সুস্থ ও সতেজ গ্রাফটিং বা কলম চারার দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। বিশ্বস্ত সরকারি কৃষি নার্সারি, বেসরকারি নার্সারি বা অভিজ্ঞ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করা উচিত, যাতে জাতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হয়।
  • বোম্বাই (Bombay): এটিও একটি জনপ্রিয় জাত। এর ফল মাঝারি আকারের, রসালো এবং মিষ্টি হয়। রং সাধারণত গাঢ় লাল হয়।
  • মাদ্রাজি (Madrasa): এই জাতের লিচু তুলনামূলকভাবে দেরিতে পাকে। ফল মাঝারি আকারের এবং মিষ্টি। এই জাতের অন্যতম সুবিধা হলো ফলন অন্যান্য জাতের চেয়ে একটু দেরিতে আসায় বাজারজাতকরণের জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়।
  • বারি লিচু-১, বারি লিচু-২, বারি লিচু-৩: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত এই জাতগুলো উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। বারি লিচু-১ এর ফলন বেশ ভালো, বারি লিচু-২ আগাম জাত এবং বারি লিচু-৩ দেরিতে পাকে।
লিচু চাষ পদ্ধতি

৩. জমি তৈরি ও চারা রোপণ

সঠিকভাবে জমি প্রস্তুত করা এবং চারা রোপণ করা লিচু গাছের সুস্থ বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

  • জমি প্রস্তুতি: প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে আগাছামুক্ত করে সমতল করে নিতে হবে। জমির চারপাশে ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
  • গর্ত তৈরি: চারা রোপণের কমপক্ষে ১৫-২০ দিন আগে গর্ত তৈরি করতে হবে। প্রতিটি গর্তের আকার ১ মিটার দৈর্ঘ্য, ১ মিটার প্রস্থ এবং ১ মিটার গভীর (১ মিটার x ১ মিটার x ১ মিটার) হওয়া উচিত। গর্তগুলো সারি করে তৈরি করা ভালো, এতে পরিচর্যা সহজ হয়।
  • গর্ত ভরাট ও সার প্রয়োগ (প্রাথমিক): গর্ত তৈরির পর গর্তের উপরের অংশের মাটি একদিকে এবং নিচের অংশের মাটি অন্যদিকে আলাদা করে রাখতে হবে। এবার প্রতিটি গর্তে ২৫-৩০ কেজি পচা গোবর, ৫০০ গ্রাম টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট), ২৫০ গ্রাম এমওপি (মিউরেট অফ পটাশ), ২৫০ গ্রাম জিপসাম, ২০ গ্রাম জিঙ্ক সালফেট এবং ১০ গ্রাম বোরন সার মিশিয়ে উপরের মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। সার মেশানো মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করে সামান্য উঁচু করে রাখতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানিতে মাটি বসে যায়।
  • চারা রোপণ: বর্ষাকালে (জুন-আগস্ট) চারা রোপণ করা সবচেয়ে ভালো। এই সময়ে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকে, যা চারাকে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।
    • রোপণ দূরত্ব: জাত এবং মাটির উর্বরতার উপর নির্ভর করে চারা থেকে চারার দূরত্ব এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ১০-১২ মিটার (প্রায় ৩৩-৩৯ ফুট) রাখা উচিত। এটি গাছের সঠিক বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং বায়ু চলাচলের জন্য অপরিহার্য। ঘন করে লাগালে পরবর্তীতে ফলন কমে যেতে পারে।
    • রোপণ কৌশল: গর্তের মাঝখানে ছোট একটি গর্ত করে কলমের চারাটি সাবধানে বসাতে হবে। চারার গোড়ার মাটি যাতে অক্ষত থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চারা বসানোর পর চারপাশে মাটি দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে হালকা চাপ দিতে হবে যাতে চারা হেলে না যায়। রোপণের পর পরই গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি দিতে হবে। চারাকে সোজা রাখার জন্য প্রয়োজন হলে খুঁটি দিয়ে ঠেস দিতে হবে।

লিচু গাছে সার প্রয়োগ পদ্ধতি

লিচু গাছের বৃদ্ধি ও ভালো ফলনের জন্য নিয়মিত ও সুষম সার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। গাছের বয়স অনুযায়ী সারের পরিমাণ এবং প্রয়োগ পদ্ধতি ভিন্ন হয়।

সারের নামপ্রতি বছর প্রতি গাছে পরিমাণ (১-৫ বছর বয়সী)প্রতি বছর প্রতি গাছে পরিমাণ (৬-১০ বছর বয়সী)প্রতি বছর প্রতি গাছে পরিমাণ (১০+ বছর বয়সী)
পচা গোবর১৫-২৫ কেজি৩০-৫০ কেজি৫০-৭৫ কেজি
ইউরিয়া২৫০-৪০০ গ্রাম৫০০-৭৫০ গ্রাম৮০০-১০০০ গ্রাম
টিএসপি২০০-৩৫০ গ্রাম৪০০-৬০০ গ্রাম৭০০-১০০০ গ্রাম
এমওপি১৫০-২৫০ গ্রাম৩০০-৫০০ গ্রাম৬০০-৮০০ গ্রাম
জিপসাম১০০-১৫০ গ্রাম২০০-৩০০ গ্রাম৪০০-৫০০ গ্রাম
জিঙ্ক সালফেট২০-৩০ গ্রাম৪০-৫০ গ্রাম৬০-৮০ গ্রাম
বোরন সার৫-১০ গ্রাম১৫-২০ গ্রাম২৫-৩০ গ্রাম

লিচু গাছে সার প্রয়োগের সময় 

সাধারণত বছরে দুইবার সার প্রয়োগ করা হয়।

  • প্রথমবার: ফল সংগ্রহের পরপরই (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) গাছের পুষ্টি ঘাটতি পূরণের জন্য এবং পরবর্তী মৌসুমে নতুন কুশি ও মুকুল আসার প্রস্তুতি হিসেবে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। এই সময়ে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং জৈব সারের অর্ধেক পরিমাণ প্রয়োগ করা হয়।
  • দ্বিতীয়বার: মুকুল আসার ঠিক আগে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) দ্বিতীয়বারের মতো সার প্রয়োগ করা উচিত। এই সময়ে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং জৈব সারের বাকি অর্ধেক পরিমাণ প্রয়োগ করা হয়। এই সময়ের সার মুকুল আসা এবং ফলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
  • প্রয়োগ পদ্ধতি: গাছের বয়স অনুযায়ী উল্লিখিত পরিমাণ সার গাছের গোড়ার চারদিকে ১-১.৫ মিটার দূরত্বের বৃত্তাকার নালায় বা গাছের ক্যানোপির নিচে ছড়িয়ে মাটির সাথে হালকাভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের পর অবশ্যই সেচ দিতে হবে, যাতে সারগুলো মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং গাছ শোষণ করতে পারে।
লিচু চাষ পদ্ধতি

৫. মুকুল আসার আগে লিচু গাছের পরিচর্যা

মুকুল আসার আগের সময়টি লিচু গাছের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সঠিক পরিচর্যা ভালো ফলনের পথ খুলে দেয় এবং মুকুল ঝরে পড়া রোধ করে।

  • সেচ: পর্যাপ্ত পরিমাণে সেচ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে শুষ্ক আবহাওয়ায়। মুকুল আসার আগে মাটিতে আর্দ্রতার অভাব হলে মুকুল শুকিয়ে ঝরে পড়তে পারে। তবে অতিরিক্ত সেচও ক্ষতিকর, কারণ এটি মুকুল ঝরিয়ে দিতে পারে। হালকা ও নিয়মিত সেচ গুরুত্বপূর্ণ।
  • ডাল ছাঁটাই (প্রুনিং): রোগাক্রান্ত, মরা বা অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হবে। এতে গাছে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে এবং নতুন মুকুল আসতে সুবিধা হয়। ফল সংগ্রহের পর এই কাজটি করা সবচেয়ে ভালো। নতুন ডালপালা ছাঁটাই করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ নতুন কুশি থেকেই মুকুল আসে।
  • রোগ ও পোকামাকড় দমন: মুকুল আসার আগে থেকেই রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাইট, মিলিবাগ এবং ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ এই সময়ে দেখা যেতে পারে। প্রয়োজনে উপযুক্ত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
  • অতিরিক্ত পুষ্টি সরবরাহ (যদি প্রয়োজন হয়): যদি গাছ দুর্বল মনে হয়, তাহলে এই সময়ে অনুখাদ্য (যেমন বোরন, জিঙ্ক) স্প্রে করা যেতে পারে, যা মুকুল ঝরা রোধে এবং পরাগায়নে সাহায্য করে।

৬. লিচু গাছে ফুল আসার পর পরিচর্যা

ফুল আসার পর থেকে ফল পাকা পর্যন্ত সময়টি খুবই সংবেদনশীল। এই সময়ে সঠিক পরিচর্যা ফলের আকার ও গুণগত মান বৃদ্ধি করে।

  • সেচ: লিচু গাছে ফুল আসার পর পরিচর্যায় সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুকুল ফোটার সময় এবং ছোট ফল ধারণের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন। লিচু গাছে পানি দেওয়ার নিয়ম (লিচু গাছে পানি দেওয়ার নিয়ম) হলো, মাটি শুকিয়ে গেলে হালকা সেচ দেওয়া। তবে অতিরিক্ত সেচ দেওয়া যাবে না, কারণ এতে ফুল বা ছোট ফল ঝরে যেতে পারে। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে গাছের গোড়ায় মালচিং (খড় বা শুকনা পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া) করা যেতে পারে।
  • পরাগায়ন: এই সময়ে পরাগায়নের জন্য মৌমাছির চলাচল বৃদ্ধি করা উচিত। রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা পরাগায়নকারী পোকামাকড়কে মেরে ফেলতে পারে।
  • ফল ঝরা রোধ: ফুল ফোটার পর এবং ফল মটর দানার মতো বড় হলে প্রাকৃতিকভাবে কিছু ফল ঝরে পড়ে। তবে অতিরিক্ত ফল ঝরা রোধ করতে জিবারেলিক অ্যাসিড বা প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর (PGR) ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ফল ধারণের হার বাড়ায়।
  • রোগ ও পোকামাকড় দমন: ফুল আসার পর ফল ছিদ্রকারী পোকা, মাইট এবং ডাইব্যাক রোগের আক্রমণ হতে পারে। এই সময়ে আক্রমণ দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে, তবে অবশ্যই মৌমাছির জন্য নিরাপদ এবং সঠিক মাত্রায়।

৭. রোগ ও পোকামাকড় দমন

লিচু গাছে বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে ফলন রক্ষা করা যায়।

  • পোকামাকড়:
    • লিচুর মাইট: পাতার নিচের দিকে বাদামী আস্তরণ বা ফোসকা দেখা যায়। আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে যায় এবং শুকিয়ে ঝরে পড়ে। মাইট দমনের জন্য সালফার ঘটিত কীটনাশক (যেমন থিওভিট বা সালফেক্স) ব্যবহার করতে হবে।
    • ফল ছিদ্রকারী পোকা: কচি ফল আক্রমণ করে এবং ফলের ভিতরে প্রবেশ করে শাঁস খেয়ে ফেলে, যার ফলে ফল পচে যায়। এই পোকা দমনের জন্য সাইপারমেথ্রিন বা ল্যাম্বডা-সাইহালোথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে, বিশেষ করে ফল ছোট থাকা অবস্থায়।
    • মিলিবাগ (ছাতরা পোকা): কচি ডগা, ফুল ও ফলের রস চুষে খায়, যার ফলে আক্রান্ত অংশ বিকৃত হয়ে যায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ইমিডাক্লোপ্রিড বা থায়ামেথোক্সাম গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করে মিলিবাগ দমন করা যায়।
    • পাতার কুঁকড়ানো পোকা (Leaf Roller): পাতার কিনারা মুড়িয়ে বাসা তৈরি করে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। ক্লোরপাইরিফস বা কার্বারিল গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করে এদের দমন করা যায়।
  • রোগ:
    • ডাইব্যাক রোগ (শুষ্ক পচন): গাছের ডালপালা আগা থেকে শুকিয়ে মরে যায়। আক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এরপর বোর্দো মিশ্রণ (কপার সালফেট ও চুন) বা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
    • পাতার দাগ রোগ: পাতায় বাদামী বা কালো দাগ হয়। এই রোগ দমনের জন্য কপার অক্সিফ্লোরাইড বা ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক স্প্রে করা যেতে পারে।
    • ফলের পচন রোগ: ফল পাকার সময় বা সংগ্রহের পর ফলের গায়ে বাদামী দাগ দেখা যায় এবং ফল পচে যায়। নিয়মিত বাগান পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক আর্দ্রতা বজায় রাখা এই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। প্রয়োজনে ম্যানকোজেব বা কার্বেন্ডাজিম স্প্রে করা যেতে পারে।

৮. লিচু গাছে পানি দেওয়ার নিয়ম

লিচুর জন্য পর্যাপ্ত সেচ অপরিহার্য, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এবং ফুল আসা ও ফল বৃদ্ধির সময়।

  • সেচ: খরার সময় ২-৩ বার সেচ দিতে হবে। মুকুল আসার আগে, ফল ধারণের পর এবং ফল বড় হওয়ার সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে। তবে লিচু গাছে পানি দেওয়ার নিয়ম (লিচু গাছে পানি দেওয়ার নিয়ম) হলো, সকালে বা সন্ধ্যায় সেচ দেওয়া, যখন সূর্যের তেজ কম থাকে। ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি সেচের পানি সাশ্রয়ী এবং কার্যকর।
  • নিকাশ: বাগানে যাতে কোনো অবস্থাতেই পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অতিরিক্ত পানি জমে গেলে শিকড় পচে যেতে পারে এবং গাছের মৃত্যু হতে পারে। প্রয়োজনে নিষ্কাশন খাল কেটে পানি সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
লিচু চাষ পদ্ধতি

৯.লিচু গাছে ফুল আসার সময় । ফল সংগ্রহ

লিচু ফল সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংগ্রহ করা হয়, জাতভেদে সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

  • সংগ্রহের সময়: ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ক হলে উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে। পাকা লিচুর মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। দিনের ঠাণ্ডা সময়ে (সকালে বা সন্ধ্যায়) ফল সংগ্রহ করা উচিত।
  • সংগ্রহ পদ্ধতি: লিচু সংগ্রহের সময় ডালপালাসহ থোকায় থোকায় কাটা হয়, এতে ফলের মান ভালো থাকে এবং পরবর্তী মৌসুমে ফুল আসার সম্ভাবনা বাড়ে। ফল তোলার সময় যাতে আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা: ফল সংগ্রহের পর সেগুলো ঠাণ্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে। দ্রুত বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে, কারণ লিচু পচনশীল ফল। প্যাকেজিং এর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন ফল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

১০. অন্যান্য পরিচর্যা ও টিপস

  • আগাছা দমন: নিয়মিত আগাছা দমন করতে হবে। আগাছা গাছের পুষ্টি শোষণ করে ফলন কমিয়ে দেয় এবং রোগ ও পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। নিড়ানি বা আগাছানাশক ব্যবহার করে আগাছা দমন করা যেতে পারে।
  • মালচিং: গাছের গোড়ায় খড়, শুকনা পাতা বা কচুরিপানা দিয়ে মালচিং করলে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ হয় এবং আগাছা দমন হয়।
  • আন্তঃফসল চাষ: লিচু গাছ ছোট থাকা অবস্থায় গাছের ফাঁকা স্থানে কিছু স্বল্পমেয়াদী সবজি বা মসলা জাতীয় ফসল চাষ করা যেতে পারে, যা কৃষকদের বাড়তি আয় এনে দেবে।
  • ট্রেনিং ও প্রুনিং: চারা অবস্থায় গাছের সঠিক কাঠামো তৈরির জন্য ট্রেনিং জরুরি। প্রতি বছর ফল সংগ্রহের পর নিয়মিত প্রুনিং (ডাল ছাঁটাই) করতে হবে। মরা, রোগাক্রান্ত, দুর্বল বা অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হবে। এতে গাছে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচল করে, যা ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক।

উপসংহার

লিচু চাষ একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হতে পারে যদি সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত জাত নির্বাচন (বিশেষ করে চায়না ৩ লিচু চাষ পদ্ধতি), লিচু গাছে সার প্রয়োগ পদ্ধতি (লিচু গাছে সার প্রয়োগের সময়), মুকুল আসার আগে লিচু গাছের পরিচর্যা, লিচু গাছে ফুল আসার পর পরিচর্যা, এবং লিচু গাছে পানি দেওয়ার নিয়ম সহ লিচু চাষের আধুনিক পদ্ধতি (লিচু চাষের আধুনিক পদ্ধতি) অনুসরণ করা হয়। কৃষকদের নিয়মিত পরিচর্যা এবং রোগ-পোকামাকড় দমনে সজাগ থাকতে হবে। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ ও সবল গাছ নিশ্চিত করা গেলে লিচুর ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। আশা করি, এই বিস্তারিত নির্দেশিকা লিচু চাষে আগ্রহী এবং সফল লিচু উৎপাদনকারী হিসেবে আপনাকে সহায়তা করবে।

শেয়ার করুন
Moshiur Rahman

I am Moshiur Rahman, an enthusiastic writer on agricultural information and research. I strive to deliver reliable and easy-to-understand information on modern agricultural technology, crop production, agricultural loans, and agricultural development, so that farmers and all those involved in agriculture can benefit.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top