মাশরুম চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকের অনেক ভুল ধারনা থাকতে পারে, আপনি হয়তো মাশরুম চাষ করতে ছাচ্ছেন কিন্তু সঠিক নিয়ম বা পদ্ধতি জানেন না। কোন সমস্যা নেই, এই আর্টিকেলটি পড়লে আপনার মধ্যে মাশরুম চাষ পদ্ধতি নিয়ে কোন সমস্যা তৈরি হবে না।
মাশরুম একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত এবং লাভজনক সবজি। এটি চাষ করার জন্য কোনো আবাদি জমির প্রয়োজন হয় না, এমনকি কোনো কীটনাশক বা ছত্রাকনাশকেরও প্রয়োজন পড়ে না। অল্প পুঁজিতে অল্প জায়গায় এটি একটি চমৎকার ব্যবসা।
অনেক মাশরুম চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৌশলগুলো জানতে চান। আজকের এই আর্টিকেল এর মধ্যে আপনি মাশরুম চাষ পদ্ধতি- বীজ তৈরি থেকে বাজারজাতকরণ A to Z জানতে পারবেন। তাহলে চলুন ধাপে ধাপে পুরো প্রসেসটা দেখে নিন/ জেনে নিন।

মাশরুম চাষ কেন লাভজনক?
মাশরুম চাষের অনেক সুবিধা রয়েছে। চলুন, মাশরুম চাষ পদ্ধতির কয়েকটি প্রধান কারণ জেনে নিই:
- কম পুঁজি: অন্যান্য কৃষিকাজের তুলনায় মাশরুম চাষে অনেক কম টাকা লাগে।
- কম জায়গা: ছোট্ট একটি ঘরে বা শেডের নিচেও মাশরুম চাষ করা যায়।
- দ্রুত লাভ: খুব কম সময়ে (সাধারণত ১৫-২০ দিন) মাশরুম তোলা যায় এবং বিক্রি করে লাভ করা যায়।
- উচ্চ পুষ্টিগুণ: মাশরুম প্রোটিন, ভিটামিন এবং মিনারেলে ভরপুর একটি স্বাস্থ্যকর খাবার।
- চাহিদা বৃদ্ধি: স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে মাশরুমের চাহিদাও বাড়ছে।
- পরিবেশবান্ধব: এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং রিসাইকেল করা যায় এমন অনেক উপাদান ব্যবহার করে চাষ করা যায়।
আরও পড়ুনঃ Benefits of mushrooms and Disadvantages of eating mushroom
মাশরুম চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র
মাশরুম চাষ পদ্ধতি শুরু করার আগে কিছু জিনিসপত্র জোগাড় করতে হবে। নিচে মাশরুম চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী একটি তালিকা দেওয়া হলো:
- বীজ (Spawn): ভালো মানের মাশরুমের বীজ নির্বাচন করা জরুরি। এটিই আপনার চাষের মূল ভিত্তি।
- সাবস্ট্রেট (Substrate): যে মাধ্যমে মাশরুম জন্মাবে। সাধারণত ধানের খড়, করাতকলের গুঁড়ো, গমের ভুসি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
- পলিথিন ব্যাগ: বীজ ও সাবস্ট্রেট মিশিয়ে পলিথিন ব্যাগে ভরা হয়।
- ক্লিপ বা সুতা: পলিথিন ব্যাগ বন্ধ করার জন্য।
- স্প্রেয়ার: জল স্প্রে করার জন্য।
- তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা: মাশরুমের ভালো ফলনের জন্য সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- জীবাণুমুক্ত করার সরঞ্জাম: গরম জল বা স্টিম দিয়ে সাবস্ট্রেট জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
কোন জাতের মাশরুম চাষ করবেন?
পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতের মাশরুম দেখা যায়, তবে বাংলাদেশে সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট জাতের চাষ বেশি হয় কারণ এগুলোর চাহিদা বেশি এবং আমাদের আবহাওয়ার সাথে মানানসই।
- ওয়েস্টার মাশরুম (Oyster Mushroom): এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সহজে চাষযোগ্য। দেখতে অনেকটা ঝিনুকের মতো বলে এর এমন নাম।
- মিল্কি মাশরুম (Milky Mushroom): এর রং দুধের মতো সাদা এবং আকারে বড় হয়। তুলনামূলকভাবে উষ্ণ আবহাওয়ায় ভালো হয়।
- স্ট্র মাশরুম (Paddy Straw Mushroom): ধানের খড়ে ভালো জন্মায় এবং দ্রুত বাড়ে।
নতুনদের জন্য ওয়েস্টার মাশরুম চাষ পদ্ধতি সবচেয়ে উপযুক্ত।
মাশরুম চাষ পদ্ধতি
১. মাশরুম চাষের প্রধান ধাপসমূহ:
মাশরুম চাষ সাধারণত ছয়টি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- ১. বাণিজ্যিক স্পন তৈরি।
- ২. স্পনসমূহ জীবাণুমুক্তকরণ (Sterilization)।
- ৩. ইনোকুলেশন (Inoculation) বা বীজ বপন।
- ৪. মাইসেলিয়াম বৃদ্ধির জন্য ল্যাবে রাখা।
- ৫. মাইসেলিয়াম সমৃদ্ধ স্পন চাষঘরে স্থানান্তর।
- ৬. মাশরুম সংগ্রহ বা হার্ভেস্টিং।
২. উপকরণ ও পরিমাণ (১০০টি স্পন তৈরির জন্য):
১০০টি স্পন (প্রতিটি ৫০০ গ্রাম) তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ:
- কাঠের গুঁড়া: ১৬ কেজি।
- গমের ভুষি: ৮ কেজি।
- ধানের তুষ: ১ কেজি।
- চুন (CaCO3): ১০০ গ্রাম।
- পানি: ২৫ লিটার (প্রয়োজন অনুযায়ী কম-বেশি হতে পারে)।

৩. মাশরুম বীজ তৈরির পদ্ধতি:
প্রথমে কাঠের গুঁড়া, গমের ভুষি, ধানের তুষ এবং চুন ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে পানি যোগ করে মিশ্রণটি তৈরি করতে হবে। মিশ্রণটি সঠিক হয়েছে কি না বোঝার উপায় হলো—এক মুঠো মিশ্রণ নিয়ে জোরে চাপ দিলে হাতে ভেজা ভাব লাগবে কিন্তু পানি ঝরবে না এবং চাপ ছেড়ে দিলে দলা পাকিয়ে থাকবে।
এরপর ৭” বাই ১০” সাইজের পিপি ব্যাগে ৫০০ গ্রাম করে মিশ্রণ ভরতে হবে। ব্যাগটি ভালোভাবে টাইট করে রাবার ব্যান্ড দিয়ে মুখ আটকাতে হবে। এরপর একটি কাঠি দিয়ে মাঝখানে ৪ ইঞ্চি গভীর গর্ত করে তাতে তুলা গুজে দিতে হবে এবং ব্রাউন পেপার দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
৪. জীবাণুমুক্তকরণ (Sterilization):
তৈরিকৃত স্পনগুলোকে অটো ক্লেভ মেশিনে ১২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৫ পিএসআই চাপে ৩-৪ ঘণ্টা রেখে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এরপর বের করে ঠান্ডা করার জন্য মেঝেতে বিছিয়ে রাখতে হবে।
আরও পড়ুনঃ সুপারি চাষ পদ্ধতি, সুপারি সার প্রয়োগ পদ্ধতি ও গাছ লাগানোর নিয়ম
৫. ইনোকুলেশন বা বীজ বপন:
এই কাজটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হবে। যিনি কাজ করবেন তাকে হাত ও শরীর ইথানল (৫০% ইথানল + ৫০% পানি) দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। ল্যামিনার এয়ার ফ্লো বা ইনোকুলেশন চেম্বারে স্পিরিট ল্যাম্প জ্বালিয়ে মাদার স্পন থেকে ৫ গ্রাম পরিমাণ বীজ প্রতিটি স্পন প্যাকেটে দিতে হবে। এই সময় ব্যবহৃত চামচও আগুনের শিখায় জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
৬. মাইসেলিয়াম বৃদ্ধি ও পরিচর্যা:
বীজ দেওয়ার পর প্যাকেটগুলো ল্যাবে বা একটি নিয়ন্ত্রিত কক্ষের র্যাকে ২০-২২ দিন রেখে দিতে হবে। কক্ষের তাপমাত্রা ২০-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাইসেলিয়াম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পুরো প্যাকেট সাদা হয়ে গেলে এটি চাষঘরে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
৭. মাশরুম সংগ্রহ (Harvesting):
চাষঘরে নেওয়ার আগে প্যাকেটে উল্টো ‘D’ আকৃতিতে কেটে নিতে হবে এবং সামান্য স্ক্র্যাপিং বা ঘষে দিতে হবে। এরপর ৫-১০ মিনিট পানিতে উল্টো করে ভিজিয়ে রাখতে হবে। প্রতিদিন ৩ বার পানি স্প্রে করতে হবে। ২ দিন পর পিন হেড বা ছোট মাশরুম দেখা দেবে এবং ৫-৭ দিনের মধ্যে মাশরুম সংগ্রহের উপযোগী হবে।
মাশরুম চাষে সতর্কতা ও টিপস
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: মাশরুম চাষে পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে জরুরি। সকল সরঞ্জাম ও স্থান জীবাণুমুক্ত রাখুন।
- সঠিক বীজ: সব সময় বিশ্বস্ত উৎস থেকে ভালো মানের বীজ কিনুন।
- তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা: সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখা ফলনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- আলো ও বাতাস: পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন।
- কীটনাশক নয়: মাশরুম চাষে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করবেন না। এটি প্রাকৃতিক উপায়েই চাষ করা হয়।
- বাজারজাতকরণ: ফলন তোলার সাথে সাথে বাজারজাত করার চেষ্টা করুন, কারণ মাশরুম দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
মাশরুম চাষে আয় ব্যয়
| ধাপ | বিবরণ | হিসাব / পরিমাণ | টাকা (৳) |
|---|---|---|---|
| ১ | স্পন (বীজ) | ১০০ ব্যাগ × ২৫ | ২,৫০০ |
| ২ | খড় / সাবস্ট্রেট | ৮–১০ মণ | ১,৫০০ |
| ৩ | পলিব্যাগ, সুতা | — | ৭০০ |
| ৪ | চুন ও জীবাণুনাশক | — | ৩০০ |
| ৫ | র্যাক / বাঁশ (১বার) | — | ২,০০০ |
| ৬ | পানি ও বিদ্যুৎ | — | ৫০০ |
| ৭ | শ্রম খরচ | আনুমানিক | ১,০০০ |
| মোট ব্যয় | ১০,০০০ | ||
| ৮ | মোট ব্যাগ | ১০০ টি | — |
| ৯ | উৎপাদন | ১.৫–২ কেজি/ব্যাগ | ১৫০–২০০ কেজি |
| ১০ | বিক্রয় মূল্য | ২০০–২৫০ টাকা/কেজি | — |
| ১১ | মোট বিক্রয় আয় | ৩০,০০০ – ৫০,০০০ | |
| ১২ | নিট লাভ (২ মাসে) | আয় − ব্যয় | ২০,০০০ – ৪০,০০০ |
মাশরুম চাষের সুবিধা ও অসুবিধা
নিচে সুবিধা ও অসুবিধা সুন্দর করে আপনার সামনে তুলে ধরা হল;
সুবিধা:
- কম খরচে অধিক লাভ।
- কম জায়গায় চাষ করা যায়।
- দ্রুত ফলন পাওয়া যায়।
- পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসম্পন্ন।
- পরিবেশবান্ধব।

অসুবিধা:
- তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর রাখতে হয়।
- জীবাণু সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- বাজারজাতকরণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয়।
আরও পড়ুনঃ ভুট্টা চাষ পদ্ধতি ও আধুনিক পদ্ধতিতে অধিক ফলন
উপসংহার
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ হলো, আপনারা চাইলে সরাসরি সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে তৈরি করা স্পন বা বীজ কিনে এনে এর চাষ শুরু করতে পারেন। এটি চাষে কোনো সমস্যা বা পরামর্শের জন্য নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিস, হর্টিকালচার সেন্টার বা সাভারের জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে যোগাযোগ করতে পারেন।
FAQ
প্রশ্ন ১: মাশরুম চাষ শুরু করতে ন্যূনতম কত টাকা লাগে?
উত্তর: মাশরুম চাষ শুরু করতে খুব বেশি টাকা লাগে না। প্রাথমিকভাবে বীজ, খড় এবং পলিথিন ব্যাগের জন্য ৫,০০০-১০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে ছোট আকারে শুরু করা যায়।
প্রশ্ন ২: এক ব্যাগ মাশরুম থেকে কতবার ফলন পাওয়া যায়?
উত্তর: সাধারণত একটি ব্যাগ থেকে ২-৩ বার ফলন পাওয়া যায়। প্রথম ফলন সবচেয়ে বেশি হয়, এরপর ধীরে ধীরে ফলনের পরিমাণ কমে আসে।
প্রশ্ন ৩: মাশরুম চাষের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা কত?
উত্তর: মাশরুমের জাত ভেদে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা কিছুটা ভিন্ন হয়। তবে ওয়েস্টার মাশরুমের জন্য ২৫-৩০°C তাপমাত্রা এবং ৭০-৮৫% আর্দ্রতা আদর্শ।
প্রশ্ন ৪: মাশরুমের বীজ কোথায় পাওয়া যায়?
উত্তর: সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত মাশরুম খামার থেকে ভালো মানের বীজ সংগ্রহ করা যায়।
প্রশ্ন ৫: মাশরুম কি বিষাক্ত হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, বুনো মাশরুমের মধ্যে কিছু বিষাক্ত জাত আছে। তবে চাষ করা মাশরুমের জাতগুলো খাওয়ার জন্য নিরাপদ। তাই সব সময় প্রমাণিত জাতের মাশরুম চাষ করুন এবং অচেনা বুনো মাশরুম খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
I am Moshiur Rahman, an enthusiastic writer on agricultural information and research. I strive to deliver reliable and easy-to-understand information on modern agricultural technology, crop production, agricultural loans, and agricultural development, so that farmers and all those involved in agriculture can benefit.



