মরিচ চাষ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য বর্তমানে একটি অধিক লাভজনক মসলা জাতীয় ফসল। কিন্তু, আপনি হয়তো জানেন এই না যে কিভাবে মরিচ চাষ করলে উচ্চফলন পাওয়া যায়। মরিচের উচ্চফলন পাওয়ার জন্য আপনাকে এখন আধুনিক মরিচ চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় মরিচ চাষ করতে হবে।
তাহলে চলুন জেনে নেই যে কিভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করলে উচ্চফলন পাওয়া যাবে। প্রথমেই জানিয়ে দেই আজকের এই আলোচনায় কি কি থাকছে! আজকের এই আলোচনায় আপনি মরিচ চাষের খুঁটি-নাটি সব জানতে পারবেন। একেবারে জমি প্রস্তুত থেকে উচ্চফলন পাওয়া এবং মরিচ চাষে সম্ভাব্য খরচ ও আনুমানিক লাভের হিসাব। তাহলে শুরু করা যাক।
মরিচ চাষ পদ্ধতি
মরিচ চাষে উচ্চফলন পাওয়ার জন্য আপনাকে আগে ভালো মরিচের জাত সম্পর্কে জানতে হবে। যে কোন জাতের মরিচগুলো উচ্চফলন দেয় এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন জাতগুলো কৃষকরা চাষ করেছে এবং ভালোফলনও পেয়েছে। তাহলে জেনে নেয়া যাক মরিচের জাত সম্পর্কে। বাংলাদেশে চাষ করা মরিচের উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর নাম নিচে দেওয়া হলো:
সেরা হাইব্রিড জাত:
১. বিজলি প্লাস
২. সনি
৩. ১৭০১
৪. ধামাকা
৫. জেএম ৮০৩
৬. বিজলি-২০২০
৭. সুপার হট
সরকারি (বারি) জাত:
৮. বারি মরিচ-১
৯. বারি মরিচ-২
১০. বারি মরিচ-৩
জনপ্রিয় দেশি ও আঞ্চলিক জাত:
১১. কারেন্ট মরিচ
১২. বগুড়ার ঝাল মরিচ
১৩. বাঁশগাড়া
১৪. বালুজুড়ি
১৫. কামরাঙ্গা বা বোম্বাই মরিচ
১৬. পাউলি
১৭. ব্ল্যাক লেডি
১৮. সূর্যমুখী মরিচ
আপনি যদি বাণিজ্যিক চাষের কথা ভাবেন, তবে বিজলি প্লাস বা সনি জাতটি বেছে নেওয়া সবচেয়ে লাভজনক হবে।
উচ্চ ফলনশীল মরিচের জাত
আপনি তো মরিচের বিভিন্ন জাত সম্পর্কে জানলেন। কিন্তু এখন জানতে হবে যে এই জাতগুলোর মধ্যে উচ্চ ফলনশীল মরিচের জাত কোনগুলি এবং কোন জাতের মরিচ উচ্চফলন দেয়। উচ্চ ফলনশীল মরিচের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- বারি মরিচ-১, বারি মরিচ-২ ,বারি মরিচ-৩। এর মধ্যে বারি মরিচ-১ সারা বছর চাষ করা যায় । এরপর, বারি মরিচ -২ গ্রীষ্মকালে এবং বারি মরিচ-৩ শীতকালে চাষ করার জন্য অনেক উপযোগী।
আরও পড়ুনঃ বারোমাসি সবজি তালিকা | বাংলাদেশের ১২ মাসের সবজি ও চাষ পদ্ধতি
বাংলাদেশের কৃষকরা কোন মরিচ বেশি চাষ করে?
এখন আপনার মনে হয়তো এই প্রশ্ন আছে যে বাংলাদেশের কৃষকরা কোন মরিচ বেশি চাষ করে? বাংলাদেশের কৃষকরা প্রধানত স্থানীয় এবং হাইব্রিড এই দুই ধরণের জাতের মরিচ বেশি চাষ করে। তবে অনেক কৃষক লম্বা ও ঝাল জাতের মরিচ চাষ করতে বেশি পছন্দ করেন। স্থানীয় জাতের মধ্যে যেমনঃ কামরাঙা, বালুজুরি এবং বগুড়ার মরিচ বেশ জনপ্রিয়। তবে বাণিজ্যিকভাবে মরিচ চাষের জন্য হাইব্রিড জাত যেমনঃ বিজলি প্লাস,সনি,ধামাকা এবং ডিভাইন ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে।
এছাড়াও, বাংলাদেশের বগুড়া এবং পঞ্চগড় জেলার এলাকার সফল কৃষকরা এখন ‘বিজলি প্লাস‘ জাতের মরিচ বেশি চাষ করছেন। কারণ এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং হেক্টর প্রতি ফলন অনেক বেশি দেয়।
মরিচ চাষের উপযুক্ত সময়
বাংলাদেশে মরিচ চাষের উপযুক্ত সময় মূলত দুটি— ১. শীতকাল বা রবি মৌসুম এবং ২. গ্রীষ্মকাল বা খরিপ মৌসুম। তবে বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে চাইলে মৌসুমভেদে বীজ বপনের সঠিক সময় জানা জরুরি।
১.শীতকালীন মরিচ চাষ
ভাদ্র থেকে আশ্বিন মাসকে মূলত শীতকালীন বা রবি মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশে বেশিরভাগ মরিচ এই সময়েই চাষ করা হয়। এই সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মরিচের ফলন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। তাই দেখে নিন কোন সময়ে কোন কাজটি করবেন!
- বীজ বপনের সময়: ভাদ্র থেকে আশ্বিন মাস অর্থাৎ ইংরেজি মাসের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
- চারা রোপণের সময়: আশ্বিন থেকে কার্তিক মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
২.গ্রীষ্মকালীন মরিচ চাষ
মাঘ থেকে ফাল্গুন মাস এই সময়কে গ্রীস্মকাল বা খরিপ মৌসুম বলা হয়। গ্রীস্মকাল বা খরিপ মৌসুমে মরিচের দাম বাজারে অনেক বেশি থাকে, তাই কৃষকরা বেশি লাভবান হয়। তবে, এই সময়ে বৃষ্টি ও গরমের কারণে রোগবালাই হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- বীজ বপনের সময়: মাঘ থেকে ফাল্গুন মাস অর্থাৎ ইংরেজি মাসের জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
- চারা রোপণের সময়: ফাল্গুন থেকে চৈত্র মাস অর্থাৎ ইংরেজি মাসের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
নোট: একজন অভিজ্ঞ কৃষি বিশেষজ্ঞের মতে, আপনি যদি বাজারে মরিচের সর্বোচ্চ দাম পেতে চান, তাহলে আপনাকে আগাম শীতকালে মরিচ চাষ করতে হবে।
এক্ষেত্রে জুলাই মাসের শেষ দিকে বা আগস্টের শুরুতে উঁচু জমিতে (যেখানে পানি জমে না) চারা রোপণ করলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকেই ফলন পাওয়া শুরু হয়। ওই সময়ে বাজারে মরিচের সংকট থাকায় ২-৩ গুণ বেশি দামে মরিচ বিক্রি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের যেমন: বগুড়া বা পঞ্চগড় জেলার সফল কৃষকরা এখন প্লাস্টিক মালচিং ব্যবহার করে বছরের প্রায় সব সময়ই মরিচ চাষ করছেন। তবে বর্ষাকালে চাষ করলে অবশ্যই জমি উঁচু হতে হবে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুব ভালো থাকতে হবে।
মরিচ চাষের জন্য জমি তৈরী
মরিচ চাষে সঠিকভাবে জমি তৈরী করতে পারলে মরিচের বাম্পার ফলন হবে। জমি তৈরী করার জন্য প্রথমতঃ জমিতে শতক প্রতি ১ কেজি চুন,গোবর ও জৈব সার ছিঁটিয়ে নিবেন। দ্বিতীয়তঃ জমি ৪/৫ কাটা দিতে হবে, যেন মাটি একদম ঝুরঝুরে হয়। আর বিশেষ করে, মরিচ চাষের ক্ষেত্রে উঁচু জায়গার দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি সেরা।
জমি তৈরির সময় প্রতি শতকে ১ কেজি হারে চুন ছিটিয়ে দিলে মাটির অম্লতা দূর হয় এবং ভবিষ্যতে গাছের শিকড়ে ছত্রাক আক্রমণ করার সুযোগ পায় না।
মরিচের বীজ বপন ও চারা উৎপাদন পদ্ধতি
অনেকেই ভাবেন জমিতে বীজ ছিটিয়ে দিলেই চারা হবে, কিন্তু মরিচ চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী চারা উৎপাদন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। তাই বীজ তলায় সারিবদ্ধভাবে বীজ বপন করে চারা তৈরি করতে হবে। সরাসরি মূল জমিতে বীজ বপন করলে অঙ্কুরোদগম হার কমে যায় এবং চারার যত্ন নেওয়া কঠিন হয়।
মরিচের উচ্চফলন পাওয়ার জন্য মরিচের বীজ বপন ও চারা রোপন পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। আপনি যদি সঠিক উপায়ে চারা রোপন করতে না পারেন তাহলে উচ্চফলন পাওয়া সম্ভব না। তাই অবশ্যই সঠিকভাবে বীজ বপন করতে হবে এবং জমিতে চারা রোপন করতে হবে।

কিভাবে বীজ বপন করলে উচ্চ ফলন পাওয়া যায়? বীজ বপনের আগে অবশ্যই বীজ শোধন করে নিতে হবে। কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ ভিজিয়ে রাখলে মাটিতে থাকা ক্ষতিকর রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। চারা যখন ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা হবে, ঠিক তখন পড়ন্ত বিকেলে মূল জমিতে রোপণ করাই উত্তম। এতে চারা মরে যাওয়ার হার শূন্যে নেমে আসে। অনেক কৃষক এই ধাপটি বাদ দেন, ফলে চারা গজানোর ২-৩ দিনের মধ্যেই গোড়া পচে মারা যায়। শোধন করলে চারার টিকে থাকার হার ৯৫% পর্যন্ত বেড়ে যায়।
মরিচ গাছে চারা রোপন পদ্ধতি
মরিচ গাছের চারা খুব ছোট বা খুব বেশি বয়স্ক হওয়া ভালো নয়। তাই, বীজতলায় চারার বয়স যখন ৩০ থেকে ৩৫ দিন হবে এবং উচ্চতা ১০-১২ সেন্টিমিটার (৪-৫ ইঞ্চি) হবে,ঠিক তখন সেটি রোপণের জন্য উপযুক্ত। চারা রোপণের জন্য পড়ন্ত বিকেল সবচেয়ে আদর্শ সময়। প্রখর রোদে চারা লাগালে গাছ নেতিয়ে পড়ে এবং শিকড় মাটিতে সেট হতে পারে না।

চারা রোপণের ক্ষেত্রে চারার দূরত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। মরিচ গাছে প্রচুর আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা উচ্চ ফলনের প্রধান শর্ত।
- লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব: ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার (২৪-২৮ ইঞ্চি)।
- চারা থেকে চারার দূরত্ব: ৪০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার (১৬-১৮ ইঞ্চি)।
অনেক কৃষক জায়গা বাঁচাতে ঘন করে চারা লাগান। এতে গাছ ঝোপালো হওয়ার জায়গা পায় না এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। তাই,সঠিক দূরত্ব বজায় রাখলে প্রতিটি গাছ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক মরিচ পাওয়া যায়।
মরিচ গাছে সার দেওয়ার নিয়ম
মরিচ গাছে যদি সঠিক নিয়মে পর্যাপ্ত পরিমানে সার প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে ভালো ফলন আশা করা যায় না। তাই,দেখে নিন কিভাবে কতটুক পরিমান সার কখন প্রয়োগ করবেন। ১ একর জমিতে সার প্রয়োগের তালিকা দেয়া হলোঃ-
| সারের নাম | মোট পরিমাণ (১ একরের জন্য) | জমি তৈরির সময় (বেসাল ডোজ) | ১ম কিস্তি (রোপণের ২৫-৩০ দিন পর) | ২য় কিস্তি (রোপণের ৫০-৫৫ দিন পর) | ৩য় কিস্তি (রোপণের ৭০-৭৫ দিন পর) |
| পচা গোবর/কম্পোস্ট | ৪,০০০ – ৫,০০০ কেজি | সম্পূর্ণ অংশ | – | – | – |
| ইউরিয়া | ৮০ – ১০০ কেজি | – | ৩৩ কেজি | ৩৩ কেজি | ৩৩ কেজি |
| টিএসপি | ৬০ – ৮০ কেজি | সম্পূর্ণ অংশ | – | – | – |
| এমওপি/পটাশ | ৫০ – ৭০ কেজি | ২৫ কেজি | ১৫ কেজি | ১৫ কেজি | ১৫ কেজি |
| জিপসাম | ২০ – ২৫ কেজি | সম্পূর্ণ অংশ | – | – | – |
| জিঙ্ক সালফেট | ৪ – ৫ কেজি | সম্পূর্ণ অংশ | – | – | – |
| বোরন | ২ – ৩ কেজি | সম্পূর্ণ অংশ | – | – | – |
মরিচ গাছে সেচ দেয়ার নিয়ম
মরিচের জমিতে রসের অভাব হলে সেচ দিতে হবে ও পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেচের পর চটা ভেঙ্গে দিতে হবে। শীত ও খরার সময় জমিতে ১৫ দিন পর পর পর্যাপ্ত পরিমানে সেচ দিতে হবে। এরপর, ফুল আসার সময় এবং ফল বড় হওয়ার সময় জমিতে পর্যাপ্ত পরিমানে আদ্রতা রাখতে হবে ।
মরিচ গাছের পোকামাকড় ও প্রতিকার
মরিচ চাষে সাধারণত মাঠপর্যায়ে ফলছিদ্রকারী পোকা,জাব পোকা ও সাদা মাছি,ক্ষুদে মাকড় এর আক্রমণ দেখা যায়। তাহলে জেনে নিন যে কোন পোকার ক্ষেত্রে আপনি কোন ঔষধ ব্যবহার করবেন এবং কিভাবে শনাক্ত করবেন যে এইটা কোন পোকার কারনে হয়েছে।
পোকামাকড় দমন:
১. ফলছিদ্রকারী পোকা মরিচের ভেতরে ঢুকে মরিচ নষ্ট করে ফেলে। ফলছিদ্রকারী পোকা দমনে নিচের সমাধান অনুসরন করুনঃ
সমাধান: থায়ামিথক্সাম + ক্লোরানিলিপ্রল (যেমন: ভলিউম ফ্লেক্সি ৫ মিলি বা ১ মুখ) অথবা সাইপারমেথ্রিন (যেমন: ওস্তাদ ২০ মিলি বা কট/ম্যাজিক ১০ মিলি) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন। ১০-১২ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলেই সুফল পাবেন।
২. জাব পোকা ও সাদা মাছি পাতার রস চুষে গাছকে দুর্বল করে দেয় এবং ভাইরাস ছড়ায়। জাব পোকা ও সাদা মাছি দমনে নিচের সমাধান অনুসরন করুনঃ
সমাধান: ইমিডাক্লোরোপ্রিড (যেমন: এডমায়ার বা টিডো ৭-১০ মিলি বা ২ মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন। ১০ দিন পরপর ২-৩ বার এটি ব্যবহার করতে হবে।
৩. ক্ষুদে মাকড় লাগলে পাতা নিচের দিকে কুঁকড়ে যায়। ক্ষুদে মাকড় দমনে নিচের সমাধান অনুসরন করুনঃ
সমাধান: সালফার গ্রুপের ওষুধ (যেমন: থিউভিট, কুমুলাস, রনোভিট বা সালফোলাক ৮০ ডব্লিউজি) ১০ লিটার পানিতে ২৫০ গ্রাম মিশিয়ে ভালো করে স্প্রে করুন।
মরণব্যাধি রোগবালাই দমন:
মরণব্যাধি রোগবালাই এর মধ্যে রয়েছে পাতা পচা বা গোড়া পচা রোগ,অ্যানথ্রাকনোজ বা ফল পচা,হলদে মোজাইক ভাইরাস। দেখে নিন কিভাবে প্রতিকার করবেন এইগুলোকে।
১. পাতা পচা ও গোড়া পচা রোগ: গোড়া পচা হলে মরিছের গাছ হঠাৎ ঢলে পড়ে মারা যায়। পাতা পচা ও গোড়া পচা রোগ দমনে নিচের সমাধান অনুসরন করুনঃ
সমাধান: কার্বেন্ডাজিম (যেমন: নোইন বা এইমকোজিম ২০ গ্রাম) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন। গোড়া পচা রোগের ক্ষেত্রে গাছের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে স্প্রে করা খুব জরুরি। ১২-১৫ দিন পরপর ২-৩ বার এটি প্রয়োগ করুন।
২. অ্যানথ্রাকনোজ (ফল পচা): মরিচের গায়ে কালো দাগ পড়ে পচে যায়, এইরকম দেখলেই বুঝতে পারবেন যে অ্যানথ্রাকনোজ হয়েছে । নিচে সমাধান দেখুনঃ
সমাধান: কার্বেন্ডাজিম ২০ গ্রাম অথবা প্রোপিকোনাজল (যেমন: টিল্ট ৫ মিলি বা ১ মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে ১০-১২ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করুন।
৩. হলদে মোজাইক ভাইরাস মূলত জাব পোকার মাধ্যমে ছড়ায়। হলদে মোজাইক ভাইরাস দমনে নিচের সমাধান অনুসরন করুনঃ
সমাধান: এই রোগ দমনে জাব পোকা মারার জন্য ইমিডাক্লোরোপ্রিড (যেমন: এডমায়ার বা টিডো) আগের নিয়মেই ব্যবহার করুন।

কিছু সতর্বাকতা: বালাইনাশক/কীটনাশক ব্যবহারের আগে এর বোতল বা প্যাকেটের গায়ের লেবেল ভালো করে বিস্তারিত পড়ুন এবং সেখানে দেয়া নির্দেশাবলি মেনে চলুন। এইগুলো ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা পোষাক পরিধান করুন এবং ব্যবহারের সময় কোনো প্রকার ধূমপান কিংবা পানাহার করা যাবে না। বালাইনাশক ছিটানো জমির পানি যাতে মুক্ত জলাশয়ে না মেশে সেদিকে খেয়াল রাখুন। বালাইনাশক প্রয়োগ করা জমির ফসল কমপক্ষে ৭ থেকে ১৫ দিন পর বাজারজাত করুন।
মরিচ গাছের পরিচর্যা
মরিচ গাছের পরিচর্যাই আপনার মরিচ ক্ষেতের অধিক ফলন নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তাই পর্যাপ্ত সার প্রয়োগ এবং সময় মতো জমিতে সেচ দেয়া আর গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। মরিচ গাছের পরিচর্যায় নিচের দেয়া কিছু পরামর্শ অনুসরণ করুন।
- সব সময় গাছের আগাছা মুক্ত রাখুন। মরিচের ক্ষেত সবসময় পরিষ্কার রাখুন, কারণ আগাছা থেকেই অধিকাংশ পোকা ও রোগের জন্ম হয়।
- পরিমিত সেচ দিতে হবে। গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেবেন না, তবে ফুল ও ফল আসার সময় মাটিতে যেন পর্যাপ্ত রস থাকে তা নিশ্চিত করুন।
- গাছের গোড়ার মাটি আলগা রাখুন। জমিতে সেচের পর মাটির উপরের স্তর নিড়ানি দিয়ে ভেঙে দিন,কেননা এতে শিকড় অক্সিজেন পাবে এবং গাছ দ্রুত বাড়বে।
- ফাঁদ ব্যবহার করুন। বিষমুক্ত উপায়ে পোকা দমনে জমিতে হলুদ আঠালো ফাঁদ ও ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করুন।
- বোরন স্প্রে করুন। মরিচ বেঁকে যাওয়া রোধ করতে এবং ফুল ঝরা কমাতে গাছে বোরন ও জিংক স্প্রে করুন।
- পিঞ্চিং পদ্ধতি অবলম্বন করুন। চারা রোপণের ২০-৩০ দিন পর ডগা হালকা ছেঁটে দিলে গাছ বেশি ঝোপালো হয় এবং ফলন বাড়ে।
- সঠিক সার প্রয়োগ তো করতেই হবে। পটাশ সার কিস্তিতে ব্যবহার করলে মরিচের রঙ উজ্জ্বল হয় এবং পচন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
- মরিচের খেত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন। প্রতিদিন সকালে ক্ষেত পরিদর্শন করুন। পাতার নিচে পোকা বা মাকড় দেখামাত্র ব্যবস্থা নিন।

মরিচ চাষে খরচ ও লাভের হিসাব
মরিচ চাষে খরচ ও লাভের হিসাব রাখা একজন দক্ষ কৃষকের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। চলুন ১ একর জমিতে মরিচ চাষ করতে আনুমানিক খরচ কত পড়বে এবং মরিচ ফলন পাওয়ার পর কিরকম লাভ হতে পারে আমরা একটা হিসাব দেখি।
| চাষের পদ্ধতি ও জাত | কাঁচা মরিচের সম্ভাব্য ফলন (কেজি) | মণে রূপান্তর (১ মণ = ৪০ কেজি) | ফলনের সময়কাল |
| আধুনিক হাইব্রিড জাত (যেমন: বিজলি প্লাস, সনি, ১৭০১) | ১০,০০০ – ১২,০০০ কেজি | ২৫০ – ৩০০ মণ | ৫ – ৬ মাস |
| উন্নত দেশি জাত (যেমন: বারি মরিচ-১, ২ বা স্থানীয় উন্নত) | ৬,০০০ – ৮,০০০ কেজি | ১৫০ – ২০০ মণ | ৪ – ৫ মাস |
| সাধারণ দেশি জাত (পুরানো পদ্ধতিতে চাষ) | ৪,০০০ – ৫,০০০ কেজি | ১০০ – ১২৫ মণ | ৩ – ৪ মাস |
উপসংহার
আশা করি যে আপনি মরিচ চাষ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন । সর্বোপরি কথা যে, আপনি যদি মরিচ চাষে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে আপনার মরিচের ফলন হবে বাম্পার । তাই উচ্চফলন পেতে চাইলে সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করুন । এছাড়াও, যদি কোনো বিষয় বুঝতে না পারেন তাহলে দয়া করে জানান । আমি চেষ্টা করব আপনাকে সহযোগিতা করার জন্য ।
FAQs
১. মরিচ চাষের জন্য আদর্শ মাটি ও জমি কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর: পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন উঁচু দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি মরিচ চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো।
২. ১ একর জমিতে মরিচ চাষ করতে কতটুকু বীজের প্রয়োজন হয়?
উত্তর: উন্নত হাইব্রিড জাতের ক্ষেত্রে ১ একর (১০০ শতাংশ) জমির জন্য প্রায় ৮০-১০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
৩. মরিচের চারা রোপণের সঠিক দূরত্ব কতটুকু হওয়া উচিত?
উত্তর: সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৪-৩০ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব অন্তত ১৮-২০ ইঞ্চি রাখা আদর্শ।
৪. মরিচ গাছে ফুল ঝরা রোধ করতে কী করতে হবে?
উত্তর: মাটিতে পর্যাপ্ত রস নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ‘বোরন’ মিশিয়ে স্প্রে করলে ফুল ঝরা দ্রুত বন্ধ হয়।
৫. মরিচের পাতা কোঁকড়ানো রোগের প্রধান কারণ কী?
উত্তর: এটি মূলত থ্রিপস (চুষি পোকা) এবং মাকড়ের কারণে হয়; যা নিয়ন্ত্রণে ইমিডাক্লোরোপ্রিড বা মাকড়নাশক স্প্রে করতে হয়।
৬. অধিক ফলনের জন্য কোন সার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: জৈব সারের পাশাপাশি পটাশ (MOP) সার কিস্তিতে প্রয়োগ করলে মরিচের আকার বড় হয় এবং ফলন অনেক বাড়ে।
৭. গাছের গোড়া পচা রোগ থেকে বাঁচার উপায় কী?
উত্তর: সবসময় ‘বেড’ পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি না জমে এবং শুরুতে কার্বেন্ডাজিম দিয়ে মাটি শোধন করতে হবে।
৮. ১ একর জমি থেকে সর্বোচ্চ কতটুকু ফলন আশা করা যায়?
উত্তর: আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড জাত চাষ করলে ১ একর থেকে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন (২৫০-৩০০ মণ) কাঁচা মরিচ পাওয়া সম্ভব।
৯. মরিচ কোন মাটিতে ভালো হয়?
উত্তর: পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা সম্পন্ন উর্বর দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটি মরিচ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
১০. মরিচ চাষের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: প্রধানত দুটি সময়—শীতকালীন ফসলের জন্য আগস্ট-অক্টোবর এবং গ্রীষ্মকালীন ফসলের জন্য জানুয়ারি-মার্চ।
১১. বর্ষাকালীন মরিচের সেরা জাত কোনটি?
উত্তর: উচ্চ তাপ ও বৃষ্টি সহনশীল বিজলি প্লাস, সনি অথবা সরকারি জাত বারি মরিচ-২।
১২. মরিচ গাছের জন্য কোন ভিটামিন/পিজিআর কার্যকর?
উত্তর: অধিক ফলন ও ফুল ঝরা রোধে ফ্লোরা (Nitrobenzene) অথবা বোরন স্প্রে করা ১০০% কার্যকর।
১৩. শীতকালীন মরিচের সেরা জাত কোনটি?
উত্তর: ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভালো ফলনের জন্য বারি মরিচ-১ অথবা বিজলি প্লাস জাত সেরা।
১৪. গ্রীষ্মকালীন মরিচের জাত কোনটি?
উত্তর: খরা ও তাপ সহনশীল হাইব্রিড জাত সনি, বিজলি এবং জেএম-৮০৩।



